রক্তবর্ণা মা বড়দেবী: কোচবিহারের পাঁচশো বছরের রাজঐতিহ্য আজও অমলিন
রাজতন্ত্র নেই, নেই রাজদরবারের সেই জৌলুস। তবু কোচবিহারের দেবীবাড়িতে আজও অটুট মা বড়দেবীর আরাধনার প্রাচীন ঐতিহ্য। রক্তবর্ণ দেবীমূর্তি, দুই পাশে জয়া ও বিজয়া এবং সিংহের পাশাপাশি বাঘের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে এই দুর্গাপুজো বাংলার শারদোৎসবে এক স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। প্রায় পাঁচশো বছরেরও বেশি প্রাচীন বলে পরিচিত এই পুজো কোচ রাজবংশের ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
ইতিহাসের পাতায় বড়দেবী
কোচবিহার জেলা প্রশাসনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জৈনাথ মুন্সির রাজোপাখ্যান গ্রন্থের বিবরণ অনুসারে বড়দেবীর মন্দির ষোড়শ শতকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। তবে পুজোর সূচনা ঠিক কোন বছরে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কোচ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা বিশ্বসিংহের সময় থেকেই এই আরাধনার প্রচলন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। অন্য একটি প্রচলিত কাহিনিতে মহারাজা নরনারায়ণের স্বপ্নাদেশের প্রসঙ্গও উঠে আসে।
লোককথা অনুসারে, বালক বিশ্বসিংহ খেলার ছলে ময়না গাছের ডাল ও বাঁশের কঞ্চি দিয়ে দেবীর রূপ কল্পনা করে পুজো করেছিলেন। সেই কাহিনির স্মৃতির সঙ্গে ময়না কাঠ ব্যবহারের ঐতিহ্যকে যুক্ত করা হয়। তবে এই বিবরণকে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক তথ্যের পরিবর্তে প্রচলিত জনশ্রুতি হিসেবেই দেখা সমীচীন।
প্রতিমার রূপে অনন্য বৈশিষ্ট্য
বড়দেবীর প্রতিমা প্রচলিত বাংলার দুর্গাপ্রতিমার থেকে বেশ আলাদা। দেবীর গায়ের রং রক্তবর্ণ। তাঁর পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের পরিবর্তে থাকেন জয়া ও বিজয়া। মহিষাসুরের গায়ের রং সবুজ এবং দেবীর সঙ্গে সিংহ ও বাঘের উপস্থিতি প্রতিমার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। ভারতের ২০১১ সালের জনগণনার কোচবিহার জেলা হ্যান্ডবুকেও বড়দেবীর প্রতিমার এই বিশেষ রূপের উল্লেখ রয়েছে।
ময়না কাঠ ঘিরে প্রাচীন আচার
বড়দেবীর পুজোর প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ময়না কাঠের পুজো। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট তিথিতে বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই কাঠ মন্দিরে আনা হয়। এরপর কাঠামোকে কেন্দ্র করে প্রতিমা নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনেও রাধাষ্টমী উপলক্ষে ময়না কাঠের পুজো এবং প্রতিমার মূল কাঠামোয় তা স্থাপনের কথা জানানো হয়েছে।
বংশপরম্পরায় চিত্রকর পরিবারের শিল্পীরা দেবীর প্রতিমা নির্মাণ করেন। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি এই শিল্পপরম্পরা কোচবিহারের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারেরও পরিচয় বহন করে।
গুপ্তপূজা ঘিরে রহস্য ও জনশ্রুতি
বড়দেবীর পুজোর অন্যতম আলোচিত অধ্যায় মহাষ্টমীর রাতের গুপ্তপূজা। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে অতীতে নরবলির প্রচলন এবং পরবর্তী সময়ে প্রতীকী বলি ও রক্ত নিবেদনের রীতি বজায় থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই আচার ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নানা বিশ্বাস ও কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। তবে প্রতিটি বিবরণের পক্ষে সমান মাত্রায় ঐতিহাসিক নথি উপলব্ধ নয়। তাই জনশ্রুতি ও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবরণকে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসের সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলাই জরুরি।
রাজতন্ত্রের অবসানেও অটুট আরাধনা
বর্তমানে কোচবিহার দেবোত্তর ট্রাস্ট বোর্ড বড়দেবীর পুজোর আয়োজন ও তত্ত্বাবধান করে। রাজপরিবারের শাসন শেষ হলেও দেবীবাড়ির এই আরাধনা স্থানীয় মানুষের আবেগ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কোচবিহার জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বড়দেবীর পুজোকে কেন্দ্র করে একসময় ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত মন্দিরসংলগ্ন এলাকায় ঐতিহ্যবাহী মেলাও বসত।
মা বড়দেবী তাই কেবল একটি প্রাচীন দুর্গাপুজোর দেবীমূর্তি নন। তাঁর আরাধনার মধ্যে মিশে রয়েছে কোচ রাজবংশের অতীত, প্রজন্মান্তরে বহমান প্রতিমাশিল্প এবং স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস। সময়ের পরিবর্তন সত্ত্বেও দেবীবাড়িতে এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা কোচবিহারের সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে আজও সমৃদ্ধ করে চলেছে।
Comments
Post a Comment