Posts

রাঙা মাটির কোলে মানভূমের গৌরব: পুরুলিয়ার ইতিহাস, ভাষা সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য​বিশেষ প্রতিবেদন

Image
​লাল মাটির পথ, শাল-পিয়ালের বন, অযোধ্যা পাহাড়ের গম্ভীর নীরবতা আর মাদলের গম্ভীর ধ্বনি— এই নিয়েই আমাদের পুরুলিয়া। কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, পুরুলিয়া পশ্চিমবঙ্গের এক এমন জেলা যার সৃষ্টি ও আত্মপ্রকাশের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব সংগ্রামের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর বিহারের তৎকালীন মানভূম জেলা ভেঙে আনুষ্ঠানিকভাবে জন্ম হয়েছিল পুরুলিয়া জেলার। ​১. ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপট ও প্রাচীন ইতিহাস ​পুরুলিয়ার ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময়। প্রাচীনকালে এই অঞ্চল ‘বজ্রভূমি’ বা ‘ঝাড়খণ্ড’ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ​জৈন ও বৌদ্ধ প্রভাব: খ্রিস্টীয় ৮ম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে এখানে জৈন ধর্মের ব্যাপক প্রভাব ছিল। চেঁয়াড়া, দেউলঘাটা, পাকবিড়রা ও বান্দোয়ানের পাথরের মন্দির এবং জৈন তীর্থঙ্করদের ভাস্কর্য আজও তার নীরব সাক্ষী। ​বিদ্রোহের রাজভূমি (জঙ্গলমহল): ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল এই লাল মাটির অঞ্চলের মানুষ। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে সংঘটিত ‘চুয়াড় বিদ্রোহ’ (১৭৬৬-১৮০৯) এবং গঙ্গানারায়ণ সিংহের নেতৃত্বে ‘ভূমিজ বিদ্রোহ’ (১৮৩২-৩...

রক্তবর্ণা মা বড়দেবী: কোচবিহারের পাঁচশো বছরের রাজঐতিহ্য আজও অমলিন

Image
রাজতন্ত্র নেই, নেই রাজদরবারের সেই জৌলুস। তবু কোচবিহারের দেবীবাড়িতে আজও অটুট মা বড়দেবীর আরাধনার প্রাচীন ঐতিহ্য। রক্তবর্ণ দেবীমূর্তি, দুই পাশে জয়া ও বিজয়া এবং সিংহের পাশাপাশি বাঘের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে এই দুর্গাপুজো বাংলার শারদোৎসবে এক স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। প্রায় পাঁচশো বছরেরও বেশি প্রাচীন বলে পরিচিত এই পুজো কোচ রাজবংশের ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। ইতিহাসের পাতায় বড়দেবী কোচবিহার জেলা প্রশাসনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জৈনাথ মুন্সির রাজোপাখ্যান গ্রন্থের বিবরণ অনুসারে বড়দেবীর মন্দির ষোড়শ শতকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। তবে পুজোর সূচনা ঠিক কোন বছরে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কোচ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা বিশ্বসিংহের সময় থেকেই এই আরাধনার প্রচলন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। অন্য একটি প্রচলিত কাহিনিতে মহারাজা নরনারায়ণের স্বপ্নাদেশের প্রসঙ্গও উঠে আসে।  লোককথা অনুসারে, বালক বিশ্বসিংহ খেলার ছলে ময়না গাছের ডাল ও বাঁশের কঞ্চি দিয়ে দেবীর রূপ কল্পনা করে পুজো করেছিলেন। সেই কাহিনির স্মৃতির সঙ্গে ময়না কাঠ ব্যবহারের ঐতিহ্যকে যুক্ত করা হ...

শরৎকালের দুর্গাপুজোর ইতিহাসে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার, ১৬১০ থেকে আজও বহমান ঐতিহ্য

Image
কলকাতার সময় | ইতিহাস ও ঐতিহ্য বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের নাম বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। প্রচলিত ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিবারের বিবরণ অনুযায়ী, ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার রায়চৌধুরীর উদ্যোগে এই পরিবারের দুর্গাপুজো শুরু হয়। কলকাতা অঞ্চলের প্রাচীনতম দুর্গাপুজোগুলির অন্যতম এই পুজো চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। ১৬১০ সালে পুজোর সূচনা কলকাতার ইতিহাসের সঙ্গে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। পরিবারের পূর্বপুরুষ লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার রায়চৌধুরী বড়িশায় দুর্গাপুজোর সূচনা করেন বলে একাধিক প্রকাশিত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ২০২২ সালে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া-র একটি প্রতিবেদনেও পরিবারের সদস্য তন্ময় রায়চৌধুরীর বক্তব্যের ভিত্তিতে ১৬১০ সালকে পুজোর সূচনাবর্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরিবারের পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য আটচালা মণ্ডপ এবং দেবী দুর্গার সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের আরাধনা। প্রাচীন আচার ও পারিবারিক রীতিনীতি অনুসরণ করে এই পুজো আজও অনুষ্ঠিত হয়। বাংলার প্রথম শরৎকালীন দুর্গাপুজো কি এখানেই? এই প্রশ্নে...

পাঁচ পায়রার আগমন ঘিরে রহস্যময় লোকবিশ্বাস, মুর্শিদাবাদের পেটকাটি দুর্গাপুজো

Image
পাঁচ পায়রার আগমন ঘিরে রহস্যময় লোকবিশ্বাস, মুর্শিদাবাদের পেটকাটি দুর্গাপুজো কলকাতার সময় | মুর্শিদাবাদ মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জের গদাইপুর গ্রামের ব্যানার্জি পরিবারের পেটকাটি দুর্গাপুজো বাংলার প্রাচীন লোকঐতিহ্যের এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। শতাব্দীপ্রাচীন এই পুজোকে ঘিরে রয়েছে নানা জনশ্রুতি ও ব্যতিক্রমী আচার। তার মধ্যে অন্যতম হল পুজোর সময় পাঁচটি বুনো পায়রার আগমন, যা স্থানীয় মানুষের কাছে এক রহস্যময় ও অবিচ্ছেদ্য ঐতিহ্য হিসেবে পরিচিত। প্রচলিত লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, পুজোর নির্দিষ্ট সময়ে পাঁচটি পায়রা এসে হাজির হয়। তাদের আগমনকে অনেকে দেবীর সঙ্গে সম্পর্কিত এক বিশেষ ঘটনা বলে মনে করেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই বিশ্বাস স্থানীয় মানুষের মধ্যে প্রচলিত। তবে পায়রাগুলির আগমনের সঙ্গে অলৌকিক কোনও ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে কি না, তার কোনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ নেই। এই পুজোর প্রধান আকর্ষণ দেবীপ্রতিমার স্বতন্ত্র রূপ। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, এক পুরোহিতের কন্যাকে ঘিরে ঘটে যাওয়া এক ঘটনার স্মৃতি থেকেই দেবীর নাম হয় ‘পেটকাটি দুর্গা’। প্রতিমার বিশেষ গঠন ও রীতিনীতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সেই লোককথা। ...

দশভুজা নন, দেবীর শুধু মুখাবয়বের পুজো! কেতুগ্রামের রায়বাড়িতে সাড়ে চারশো বছরের ঐতিহ্য

Image
কেতুগ্রাম: দেবীর নেই হাত-পা, নেই অসুরদলনরত দশভুজা রূপ। পূজিত হন শুধু দেবী দুর্গার মুখাবয়ব। পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামের গোমাই গ্রামের রায়বাড়িতে দুর্গাপুজোর এই ব্যতিক্রমী রীতি আজও বহন করে চলেছে বাংলার প্রাচীন পারিবারিক পুজোর ঐতিহ্য। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, রায়বাড়ির এই পুজোর সূচনা করেছিলেন পরিবারের পূর্বপুরুষ গোবিন্দ রায়। প্রায় সাড়ে চারশো বছর ধরে চলে আসা এই পুজোকে ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা। জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রথমবার দুর্গাপুজোর আয়োজনের সময় দশভুজা প্রতিমা ভেঙে গিয়েছিল। এরপর স্বপ্নাদেশে দেবীর মুখাবয়বকেই পুজো করার নির্দেশ পান গোবিন্দ রায়। আরেকটি প্রচলিত কাহিনিতে রয়েছে, গ্রামের ঠাকরুন পুকুরে স্নান করতে গিয়ে তিনি এক রহস্যময়ী নারীর মাথা ও গলা জলের উপরে দেখতে পান। পরে স্বপ্নাদেশের মাধ্যমে সেই রূপেই দেবীর আরাধনা শুরু হয় বলে কথিত রয়েছে। রায়বাড়ির পুজোর আরও একটি বিশেষ আকর্ষণ বিসর্জনের রীতি। দেবীর মুখাবয়ব দোলায় চাপিয়ে গ্রাম পরিক্রমা করানোর পর ঠাকরুন পুকুরে নিরঞ্জন করা হয়। প্রচলিত প্রথায় চণ্ডীপাঠও হয় না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই পুজো শুধু একটি পরিব...

বাংলার দুর্গাদালান ও চণ্ডীমণ্ডপ: ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও সমাজজীবনের দুই অধ্যায়

Image
 বাংলার সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে দুর্গাদালান ও চণ্ডীমণ্ডপ। ইট-পাথরের এই প্রাচীন স্থাপনাগুলি শুধু ধর্মীয় উপাসনার ক্ষেত্র নয়, বাংলার সামাজিক জীবন, লোকাচার ও স্থাপত্য-ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। তবে নাম ও ব্যবহারে কাছাকাছি মনে হলেও দুর্গাদালান ও চণ্ডীমণ্ডপের মধ্যে রয়েছে কিছু মৌলিক পার্থক্য। দুর্গাদালান: বনেদি বাংলার দুর্গোৎসবের কেন্দ্র দুর্গাদালান মূলত বনেদি বাড়ি ও জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিশেষ স্থাপত্য-প্রাঙ্গণ। খিলানযুক্ত স্তম্ভ, প্রশস্ত উঠোন, অলংকৃত দেওয়াল এবং প্রতিমা স্থাপনের উপযোগী বেদি এর পরিচিত বৈশিষ্ট্য। পুজোর সময় এই প্রাঙ্গণ পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় মানুষের মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠত। দুর্গাপুজোর আচার-অনুষ্ঠান, ভোগ বিতরণ ও সাংস্কৃতিক পরিসরের মধ্য দিয়ে দুর্গাদালান পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারক হয়ে উঠেছে। চণ্ডীমণ্ডপ: ধর্মীয় আরাধনা থেকে গ্রামীণ সমাবেশ চণ্ডীমণ্ডপের পরিচয় মূলত চণ্ডী বা দেবীর আরাধনার সঙ্গে যুক্ত। বাংলার বহু গ্রামে এই ধরনের মণ্ডপ ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক সমাবেশের ক্ষেত...

বিলুপ্তির পথে দুই বাংলার সুপ্রাচীন ঐতিহ্য ‘আলপনা’ শিল্প

Image