ঝুড়িতে চেপে গ্রামে এসেছিলেন স্বয়ং মা কালী! সাড়ে ৪৫০ বছরের ঐতিহ্যে আজও অমলিন সোনামুখীর ‘হটনগর কালী

 ‘কালী-কার্তিকের শহর’ নামে পরিচিত বাঁকুড়ার প্রাচীন পুর শহর সোনামুখী। এই শহরের পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে অজস্র অলৌকিক কাহিনি ও লোককথা। তবে তার মধ্যে সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ও আকর্ষণীয় ইতিহাসটি হলো সোনামুখীর অতি প্রাচীন হটনগর কালী পুজোকে ঘিরে। সাড়ে চারশো বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে এসেও এই পুজোকে কেন্দ্র করে ভক্তদের আবেগ ও উদ্দীপনা আজও অমলিন।
১. আগমনের অলৌকিক কাহিনি
জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ৪০০ বছর আগে সোনামুখীর বাসিন্দা তারিণী সূত্রধর নামের এক বৃদ্ধা পাশের বড়জোড়ার নিরসা গ্রামে চিঁড়ে বিক্রি করতে যেতেন। একদিন ফেরার পথে খালের পাড়ে তাঁর সঙ্গে দেখা হয় এক ছোট্ট শিশুকন্যার। শিশুটি বৃদ্ধার সঙ্গে তাঁর বাড়ি যাওয়ার বায়না ধরে। বৃদ্ধা প্রথমে রাজি না হলেও, মেয়েটির আবদারে শেষ পর্যন্ত তাকে নিজের মাথার খালি চিঁড়ের ঝুড়িতে বসিয়ে নিয়ে হাঁটতে শুরু করেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো— শিশুটি ঝুড়িতে ওঠার পরেও ঝুড়িটি ভারী তো হয়ইনি, বরং হাওয়ার মতো হালকা হয়ে যায়! বাড়ি পৌঁছে ঝুড়ি নামাতেই বৃদ্ধার চক্ষু চড়কগাছ। সেখানে কোনও শিশুকন্যা ছিল না, বদলে রাখা ছিল দুটি বিশেষ শিলা বা পাথরের খণ্ড। সেই রাতেই স্বপ্নে দেবী কালীর সাক্ষাৎ পান বৃদ্ধা এবং শিলাখণ্ড দুটি পুজো করার নির্দেশ লাভ করেন।
২. নামকরণ ও প্রাচীন মন্দির প্রতিষ্ঠা
স্বপ্নাদেশের পর, এলাকার সিদ্ধপুরুষ হট যোগী নামের এক সাধক ওই অলৌকিক পাথর দুটির পুজো-আরাধনা শুরু করেন। সেই সাধকের নাম অনুসারেই দেবীর নাম হয় ‘হটনগর কালী’।
পরবর্তীকালে স্থানীয় জমিদার পত্নী কাদম্বরী দেবীর বিশেষ উদ্যোগে দেবীর স্থায়ী মন্দির নির্মিত হয়। আজও এই মন্দিরের প্রবেশদ্বারে খোদাই করা রয়েছে মাথায় চিঁড়ের ঝুড়ি নিয়ে বৃদ্ধার সঙ্গে দেবীর আগমনের সেই অপরূপ ভাস্কর্য। প্রাচীন রীতি ও সামাজিক মেলবন্ধনের স্মারক হিসেবে আজও সূত্রধর পরিবারের বংশধরেরাই দেবীর ঘট আনা এবং বিসর্জনের বিশেষ অধিকার ও দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
৩. অলৌকিক প্রকৃতি ও বিশ্বাস
হটনগর কালী মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেই লোকগাথা যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই মন্দির চত্বর ও দেবীর শিলাকে ঘিরে রয়েছে নানা অমীমাংসিত রহস্য ও বিশ্বাস:
 * আঁকড় গাছ ও শেকড়ের রহস্য: দেবীর নির্দেশে যে আঁকড় গাছের নীচে শিলা দুটি স্থাপন করা হয়েছিল, সেই প্রাচীন গাছটি আজও অক্ষত। সাধারণ আঁকড় গাছে অজস্র তীক্ষ্ণ কাঁটা থাকলেও এই বিশেষ গাছটিতে আশ্চর্যভাবে কোনও কাঁটা নেই। এমনকি একাধিকবার চেষ্টা করেও এই গাছের মূল বা শেকড় কোথায় গিয়েছে, তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।
 * ঋতুভেদে পাথর বদল: ভক্তদের পরম বিশ্বাস, দেবীর রূপ হিসেবে পূজিত এই পাথর দুটির গায়ের রং বিভিন্ন ঋতুতে নাকি প্রাকৃতিক নিয়মে বদলে যায়।
৪. বাৎসরিক উৎসব ও উদযাপন
যদিও সারা বছর ধরে মন্দিরে দেবীর নিত্যপুজো চলে, তবুও কার্তিক মাসের দীপান্বিতা অমাবস্যায় এই পুজোকে কেন্দ্র করে এক সুবিশাল উৎসবের রূপ নেয়। টানা ৫ দিন ধরে চলে বিশেষ বাৎসরিক উৎসব ও মেলা। শুধু বাঁকুড়া নয়, পার্শ্ববর্তী জেলাগুলি থেকেও বহু মানুষ তাঁদের মনস্কামনা জানাতে ও দেবীর দর্শন পেতে এই ঐতিহাসিক মন্দিরে সমবেত হন।
ভক্তি, বিশ্বাস এবং রহস্যময় লোককথার মেলবন্ধনে সোনামুখীর হটনগর কালী আজও আঞ্চলিক লোকসংস্কৃতির এক অনন্য প্রতীক হিসেবে স্বমহিমায় বিরাজমান।

Comments

Popular posts from this blog

ব্যারকপুর অন্নপূর্ণা মন্দির

মাদপুরের মা মনসা

হরিনাভি