শরৎকালের দুর্গাপুজোর ইতিহাসে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার, ১৬১০ থেকে আজও বহমান ঐতিহ্য



কলকাতার সময় | ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের নাম বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। প্রচলিত ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিবারের বিবরণ অনুযায়ী, ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার রায়চৌধুরীর উদ্যোগে এই পরিবারের দুর্গাপুজো শুরু হয়। কলকাতা অঞ্চলের প্রাচীনতম দুর্গাপুজোগুলির অন্যতম এই পুজো চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।

১৬১০ সালে পুজোর সূচনা

কলকাতার ইতিহাসের সঙ্গে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। পরিবারের পূর্বপুরুষ লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার রায়চৌধুরী বড়িশায় দুর্গাপুজোর সূচনা করেন বলে একাধিক প্রকাশিত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ২০২২ সালে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া-র একটি প্রতিবেদনেও পরিবারের সদস্য তন্ময় রায়চৌধুরীর বক্তব্যের ভিত্তিতে ১৬১০ সালকে পুজোর সূচনাবর্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

পরিবারের পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য আটচালা মণ্ডপ এবং দেবী দুর্গার সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের আরাধনা। প্রাচীন আচার ও পারিবারিক রীতিনীতি অনুসরণ করে এই পুজো আজও অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলার প্রথম শরৎকালীন দুর্গাপুজো কি এখানেই?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে ইতিহাসের কয়েকটি পৃথক দাবিকে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাংলায় প্রথম শরৎকালীন দুর্গোৎসবের সূচনা নিয়ে ইতিহাসচর্চায় রাজা কংসনারায়ণের তাহেরপুরের পুজো, নদিয়ার ভবানন্দ মজুমদারের পুজো এবং সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পুজোর উল্লেখ পাওয়া যায়। বিভিন্ন বিবরণে এই পুজোগুলির সূচনাকাল যথাক্রমে ষোড়শ শতকের শেষভাগ থেকে সপ্তদশ শতকের গোড়ার মধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে।

আউটলুক-এর একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় রাজা কংসনারায়ণের পুজোকে ১৫৮০ বা ১৫৮২ সালের সম্ভাব্য প্রাচীন শরৎকালীন দুর্গোৎসব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পুজোকে কলকাতার প্রাচীনতম দুর্গাপুজো হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অতএব, বাংলার সর্বপ্রথম শরৎকালীন দুর্গাপুজো সাবর্ণ রায়চৌধুরী বাড়িতেই হয়েছিল—এমন দাবি সর্বসম্মত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তবে ১৬১০ সালে শুরু হওয়া এই পুজো কলকাতার দুর্গোৎসবের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীন নিদর্শন।

পারিবারিক পুজো থেকে সর্বজনীন উৎসব

এক সময় বাংলার দুর্গাপুজো মূলত জমিদার ও বিত্তশালী পরিবারের আঙিনায় অনুষ্ঠিত হতো। পরবর্তী সময়ে বারোয়ারি ও সর্বজনীন পুজোর প্রসারের মধ্য দিয়ে এই উৎসব বৃহত্তর সমাজের অংশ হয়ে ওঠে। সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পুজো সেই বনেদি পারিবারিক দুর্গোৎসবের ঐতিহ্যকে আজও বহন করছে।

এই পুজোর গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় আচারে সীমাবদ্ধ নয়। কলকাতার নগরায়ণের আগের সময়ের সামাজিক ইতিহাস, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং বাংলার দুর্গোৎসবের বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।

চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা বড়িশার এই পুজো তাই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক মূল্যবান সাক্ষ্য। বাংলার প্রথম শরৎকালীন দুর্গাপুজো নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, কলকাতার প্রাচীন দুর্গাপুজোগুলির মধ্যে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পুজোর স্থান যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা বিভিন্ন প্রকাশিত ঐতিহাসিক বিবরণে প্রতিফলিত হয়েছে।

তথ্যসূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, ৪ অক্টোবর ২০২২; আউটলুক-এ প্রকাশিত দুর্গাপুজোর ইতিহাসবিষয়ক পর্যালোচনা; সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদের ঐতিহ্যসংক্রান্ত বিবরণ।

Comments

Popular posts from this blog

ব্যারকপুর অন্নপূর্ণা মন্দির

হরিনাভি

রাইপুরের মহামায়া